হিজল কন্যার ডায়েরি
By Arpita Das
আমি ভূমিপুত্রী— জলে ডোবা ইতিহাসের নীরব রক্ষাকর্ত্রী।
আমার কণ্ঠে উচ্চারিত শব্দগুলি শুধু কবিতা নয়, এক একটি স্মৃতিমুদ্রিত পালাবলি, যা কৈবর্ত জনপদের আদি-অন্ত, আচার-ব্রত, নারীর শ্রম-স্মৃতি, লোকবিশ্বাস ও প্রেমের আবছা আবরণে গঠিত এক অন্তর্দহনশীল স্বর।
"হিজল কন্যার ডায়েরি’— একটি একক কবির আত্মবয়ান নয়, এ কালের আত্মা-লিপি, একজন নারীর অন্তর্নিহিত জনপদস্বর, যে নারী কেবল লেখিকা নয়, ইতিহাসের শ্রোতা, কাঁধে কলসি চাপানো কিশোরী, করতালে হরি-নাম তোলা অন্নপূর্ণা অথবা শিমুলগাছের ছায়ায় প্রথম পড়তে শেখা এক কাঁচা নাম। এখানে মানুষ কেবল সামাজিক সত্তা নয়— তারা কর্মঠ শরীর, মৌখিক ঐতিহ্য, পারিবারিক ধর্ম, এবং জনসংস্কৃতির অনির্বচনীয় বাহক; তাঁদের জীবন যেমন পরিশ্রমে বাঁধা, তেমনি বিশ্বাসে উন্মোচিত, আর নারীর শরীর হয়ে উঠেছে সেই পরম্পরার শ্রবণীয় অথচ নিঃশব্দ পৃষ্ঠপট।
এই কাব্যগ্রন্থ জলে গাঁথা, মাটিতে রোপা, শ্বাসে ধরা—এখানে কবিতার শরীরে জন্মেছে শনবিল। এখানে শনের ছাউনির নিচে “চিঁড়ে কুটার সকাল” আছে, বিলের বন্যার ঘোলা জলে প্রেমের “ভাসমান ঋণ” ভেসে যায়, সাঁঝবাতির অলস আলোয় “জ্বরাজ্বরি দেবীর” ব্রত উঠে আসে গাঁয়ের পরম্পরায়। “বেডা অচ তে অকন বাইরো”— এই এক বাক্যে যেমন শৈশব জেগে ওঠে সাহসে, “খোমা”, “পদ্মপুরাণ”, “মনসার সন্ধ্যা”, “মোকাম আর কালীবাড়ি”— এইসব শব্দে সুরে-আখরে ফুটে ওঠে লোকসংস্কৃতির মহাকাব্যিক চেহারা।
আমি আঞ্চলিক ভাষাকে শুধু ব্যবহার করিনি, তাকে আত্মার মত ধারণ করেছি, কারণ এই ভাষা আমার ঠাম্মার চোখের নিচের রেখা, এই ভাষা শিউলির শিশির, গুড়-চিঁড়ার গন্ধ, অথবা “ভুলা পোড়ার উৎসব”-এর রাত।
আমার কবিতার শরীর জলে ভেজা— কখনো “বিলের মুখে বড় গাইন”, কখনো “মাটির হাঁড়ির তাপ”।
আমি লিখেছি এক আঞ্চলিক নরনারীর জীবনের ছায়াপাত। আমার কাব্যে কেবল স্মৃতি নেই— আছে ভাষার পুনরুদ্ধার, আছে লোকজ পৌরুষের ও নারীত্বের যৌথ স্বরলিপি।
এখানে “মাঘমণ্ডল”, “সিংড়া”, “ধানজাগার সাধ”, “জিও জিও রে লোকাই বানিয়া সুন্দর”— এইসব গান/অনুরণন/ধ্বনি—সব মিলিয়ে গঠিত হয়েছে জলতীর্থের অলিখিত কাব্যপঞ্জি।
আমি চাইনি এই কবিতাগুলি মান্য ভাষায় ঢুকিয়ে ফেলতে, তাই রেখেছি "চিঁড়া’, "গাইন’, "বুলে’, "সুটকেস’, "কাঠের কুটনি’, "কলসির মুখ’—এইসব শব্দ, যা একবার উচ্চারণ করলেই বোঝা যায়— এ কণ্ঠ ভূমিসংলগ্ন, শরীরলিপ্ত।
আমার পূর্বপুরুষরা ‘উন্নয়নের মানচিত্রে’ ছিল না, তারা ছিল বন্যার জলে, মায়ের কোলে, নুন-ঝালের থালায়, কিংবা সেই অন্ধকার নৌকায়, যেখানে প্রথম প্রেম, প্রথম সাহস, আর প্রথম ভয় আঁকা ছিল নির্দ্বিধায়।
এই কাব্যগ্রন্থ সেইসব উচ্চারণের এক দলিল, যেখানে নেই কেন্দ্র-নির্ধারিত জাতিগত সনদ, কিন্তু আছে প্রান্তিক নারীর অন্তর্জল ভাষ্য— এক উত্তরসূরির লেখনী, যিনি বলে না কেবল “আমি”, বরং বলেন “আমরা”— আমরা যারা ঘাম দিই, চাষ করি, মেয়ে হয়ে উঠি, দেবী পূজি আর প্রতিটি অক্ষরে শরীর ও সংস্কৃতির প্রাচীন আলো রেখে যাই।
এই গ্রন্থে আমি পরিপূর্ণভাবে নিমগ্ন হয়েছি লোকবিশ্বাস-নির্ভর গৃহ-সংস্কৃতি, ধর্মানুষঙ্গ ও আচার-আচরণগত স্মৃতি-চর্যার রূপান্তরে। লোকসংস্কৃতির মৌখিক অনুষঙ্গ যেমন আছে, তেমনই আছে ভাষার স্নায়ুব্যথা। সামাজিক বিভাজন, শ্রেণি-সংকট, কৃষিভিত্তিক জীবনসংগ্রাম, জলে-ভেসে-থাকা চিহ্নহীন যাপন, নিষিদ্ধ প্রেম, চুপচাপ মাতৃত্ব, যৌনতা ও শ্রমিক নারীর দৈহিক ক্লান্তি— সবকিছু এই কাব্যবুননে এক অপরিহার্য রূপক।
এই কাব্যগ্রন্থে ভাষা কেবল বাহন নয়— এ এক প্রতিরোধী শরীর, যেখানে আঞ্চলিক শব্দভাণ্ডার, বাক্প্রক্ষেপণ ও মৌখিক সংলাপগুলি
যৌথ স্মৃতির কণ্ঠস্বর রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এখানে ভাষার প্রতিটি শব্দ যেন মাটি, জল, ঘাম আর স্তব্ধ দীর্ঘশ্বাসে সংরক্ষিত। আমার কবিতা শরীরী, স্মৃতিসিক্ত ও দ্রোহচিহ্নিত। আমি লিখেছি সেইসব নারীর হয়ে, যারা কবিতা লেখেন না, কিন্তু প্রতিদিনের যাপনে গেঁথে রাখেন অলিখিত মহাকাব্য। এই ডায়েরি তাঁদের নামহীন অস্তিত্বের নীরব অনুবাদ। এখানে স্মৃতি জ্যামিতিক নয়, গোল— বিলের ঘূর্ণি, কাঁসার থালা, সিদল ভর্তা, ভুলা, নাইওর, শালপাতা—
সব একসাথে বাঁধা এক অন্তরনাক্ষত্রে। এই কাব্য তাই শুধুই শৈল্পিক উপস্থাপন নয়, এ এক আলোকায়িত লোকস্মৃতি-সংগ্রহশালা, যেখানে নারীকণ্ঠে বলা প্রতিটি পঙক্তি, প্রতিটি আঞ্চলিক শব্দ হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের দলিল, অস্তিত্বের আয়না, ও প্রান্তিক গৌরবের সংহত চিহ্ন। আমি লিখেছি, কারণ শনবিলের মানুষ শুধু নৌকা চালায় না, তারা ইতিহাসও বহন করে; আমি লিখেছি, কারণ হিজলগাছের ছায়া কেবল ছায়া নয়, এক নারীর ক্লান্তি, প্রেম, ধৈর্য আর উৎসর্গের চিহ্ন; আমি লিখেছি, কারণ এই কাব্যগ্রন্থ যদি না রচিত হতো, তবে আমার মাতৃসম্ভূতা, কন্যাসংস্কৃতি, লোকাচারিক সত্তা এবং প্রান্তিক ইতিহাস মুছে যেত নির্বাক সভ্যতার উৎসবে।
আমার নাম নাই থাক, আমি হিজল কন্যা।
আমার এই কাব্যগ্রন্থই আমার চিহ্ন, আমার ভাষ্য, আমার অস্তিত্বের ঘোষণা।
আমার এই কবিতা একটি নারীর মুখে শনবিলের আত্মকথা।
"হিজল কন্যার ডায়েরি” কেবল একটি গ্রন্থ নয়— এ এক নারীর সংবেদী সত্তার জলচিহ্ন, একটি প্রান্তিক সংস্কৃতির আন্তঃপাঠ, এ এক টিকে থাকার দলিল, যেখানে শব্দ আর স্তব্ধতা মিলিয়ে রচিত হয় আত্মপরিচয়ের মহাগাথা।
— হিজল কন্যা
(প্রান্তিক কণ্ঠের আত্মভাষ্য)
ISBN
978-81-957846-8-4
Published Date
30 Nov 2025
Publisher
UTTTARSURI
Language
Bengali
Pages
95
Stock
10